রমজান দোরগোড়ায়। ঈদ আসতে বাকি আরও মাস দেড়েক। এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক ফ্যাশন হাউজ ঈদের পোশাক তোলা শুরু করেছেন, পাইকারিতেও স্টক বেড়েছে ঈদকেন্দ্রিক পোশাকের। গত দুই বছরের লোকসান কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তবে করোনাকেন্দ্রিক শঙ্কা কাটলেও এবার তাদের চোখ রাঙাচ্ছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।
করোনার কারণে গত দুই বছর ঈদ ছিল অনেকটা মলিন। বিধিনিষেধের জেরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো খুলতেই পারেননি ব্যবসায়ীরা। সংক্রমণের ভয়ে ক্রেতারাও ছিলেন অনেকটা ঘরবন্দি। অথচ ঈদের কেনাবেচাই ব্যবসায়ীদের সারাবছর ব্যবসার সাহস জোগায়। এবার লকডাউন কিংবা বিধিনিষেধ নেই। তবে আছে যুদ্ধের হুংকার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের গায়ে হাত দেওয়ার জো নেই।
এর মধ্যে আবার রোজা উপলক্ষে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। এ অবস্থায় ঈদের কেনাকাটা কেমন হবে তা নিয়ে শঙ্কায় গত দুই বছর লোকসান গোনা ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, দুই বছর পর সত্যিকারের খুশির ঈদ আসছে, তাদের প্রস্তুতিও খুব ভালো। তবে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে মানুষ খাবার কিনবে না পোশাক কিনবে তা নিয়েই এখন সংশয়। শেষ পর্যন্ত ঈদের জন্য আনা পণ্য পুরোপুরি বিক্রি হওয়া নিয়ে তাই শঙ্কায় তারা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, রোজার ঈদে দেশে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক, ঈদ নিয়ে উচ্ছ্বাসের মানুষের কমতি নেই। মে মাসের ১ থেকে ২ তারিখের মধ্যে এবারের ঈদের তারিখ পড়তে পারে। সে অনুযায়ী এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঈদের বাজার জমজমাট হবে। কেননা ওই সময় চাকরিজীবীরা ঈদের বেতন-বোনাস পেয়ে যাবেন।
এবার ঈদবাণিজ্যে শঙ্কার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমছে না। ভোগ্যপণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। মানুষ এখন ভোগ্যপণ্য সামলাবে না ঈদের বাজার নিয়ে চিন্তা করবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তুতি আছে। সেভাবে পণ্য মার্কেটে সাজাচ্ছি। আশা তো ছিল এবার ভালো কিছু করবো। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের প্রভাব, ছুটি এসব মাথায় রেখেই এগোচ্ছি।
কিন্তু ভয় হচ্ছে যুদ্ধ নিয়ে। এটার স্থায়িত্ব বাড়লে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাবে। এই ব্যবসায়ী বলেন, যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছি সেটা যদি ওঠাতে না পারি তাহলে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। করোনার দুই বছরের ক্ষতি এখনো পোষাতে পারিনি। এবারও যদি আশানুরূপ বিক্রি না হয় তাহলে তা ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো হবে না। মিরপুর, ধানমন্ডি ও উত্তরা ঘুরে দেখা গেছে, অল্প অল্প করে ঈদের পোশাক তোলা শুরু করেছে ফ্যাশন হাউজগুলো।
শাবাব লেদারের প্রতিষ্ঠাতা মাকসুদা খাতুন বলেন, ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ব্রান্ড হাউজ থেকে খুব ভালো অর্ডার পাচ্ছি। শুধু আমরা নয়, সবাই ভালো অর্ডার পাচ্ছে। গত দুই বছরে চারটা ঈদ আশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেননি উদ্যোক্তারা। এবার যেহেতু করোনার বিধিনিষেধ নেই, এবার রোজা ও ঈদে ভালো ব্যবসা হবে সেই প্রত্যাশা তো করতেই পারি।
‘মানুষের কেনাকাটা বাড়বে, দুই বছরের ক্ষতি পোষাবো এমন ভাবনা থেকে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে শঙ্কাও আছে। আমরা ছোট মানুষ বড় সমস্যার কথা কম চিন্তা করি। বড় বড় স্বপ্ন দেখি, এবার বিক্রি হলে গত বছরের ক্ষতি কিছুটা হলেও হয়তো কাটিয়ে উঠতে পারবো।’
ঈদ উপহারে বরাবরই মোবাইলসহ ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের কদর থাকে। তবে প্রযুক্তিপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে খুব বেশি একটা উচ্ছ্বাস নেই এ খাতের ব্যবসায়ীদের। মিরপুর-১০ নম্বর শাহ আলী মার্কেটের প্রযুক্তিপণ্যের দোকান আইটি পার্কের স্বত্বাধিকারী মো. শামীম ইসলাম বলেন, ল্যাপটপ-মোবাইলের দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চায়না বন্ধ ছিল তখন পণ্যের অনেক ক্রাইসিস ছিল। আমরা বেশি দামে পণ্য কিনে এনেছি। এখন আবার শিপমেন্ট কস্ট হাই। এখনো চড়া দামে কিনতে হচ্ছে আমাদের।
তিনি বলেন, মধ্যবিত্তরা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা রেঞ্জের মোবাইল কেনেন। তরুণরা যে ধরনের স্পেসিফিকেশনের মোবাইল চায় সেগুলোর দাম বেড়েছে। আবার আসুস ব্র্যান্ডের যে ল্যাপটপের সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল সেটা ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি করা যেত। কিন্তু এখন তা ২৯ হাজার টাকা বিক্রি করা যাচ্ছে না। ল্যাপটপের দাম ১৫শ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এমন অবস্থায় বাড়তি দাম দিয়ে প্রযুক্তিপণ্য কেনাকাটা করতে এবার ক্রেতারা আগ্রহী কম হবেন।
জেনিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, ঈদে কেমন কেনাকাটা হবে সেটা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। খুব একটা কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে হতে পারে আমাদের। জিনিসপত্রের যে দাম, মানুষ এখন জান বাঁচাবে না অন্য জিনিস কিনবে সেটা নিয়ে সন্দিহান। এটা বিরাট ক্রাইসিসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ ট্রাকের পেছনে দৌড়াচ্ছে। মধ্যবিত্ত স্ট্রাগলের মধ্যে পড়ে গেছে।
‘ঈদের মার্কেটিং কতটুকু হবে সেটি নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা প্লানিং করছিলাম নতুন করে অর্ডার বাড়াবো, যেহেতু কোভিডটা মোটামুটি চলে গেছে। কিন্তু এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে অর্ডার নিয়ে আমাদের হয়তো নতুন করে ভাবতে হবে।’