ভারতীয় সেনাদের গুলিতে ৬ নাগা বিদ্রোহীর মৃত্যু
আন্তর্জাতিক : ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সেনাদের গুলিতে নাগাল্যান্ড স্বাধীনতা আন্দোলনের ৬ কর্মী নিহত হয়েছেন। শনিবার (১১ জুলাই) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজ্যের খোঁসা এলাকায় সেনাদের সাথে নাগা বিদ্রোহীদের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আসাম রাইফেলসের এক জওয়ান আহত হয়েছেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিহত সবাই নাগা স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অভ নাগালিম’ (এনএসসিএন-আইজ্যাক-মুইভা)-এর সদস্য বলে জানা গিয়েছে।
এর আগে সংগঠনটির সঙ্গে থমকে থাকা শান্তি আলোচনা গত বছরের শেষে ফের শুরু হয়। এনএসসিএন সেই আলোচনার পর বলেছিল যে, “স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের দাবি তারা ছেড়েছে। কিন্তু যে পতাকার জন্য এত দশকের লড়াই তার দাবি ছাড়া যায় না।”
আলোচনার পর বিবৃতিতে তারা জানিয়েছিল, “২২ বছর ধরে আলোচনার পরে ভারত সরকার এখন মারপ্যাঁচ শুরু করেছে, কথা রাখছে না। ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’-এ স্বতন্ত্র নাগা ঐতিহ্য মেনে নিতে ভারত সরকার সম্মত হলেও মূল চুক্তির ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে আসছে।”
নাগাল্যান্ডের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে পৃথক পতাকা ও সংবিধানের দাবি করে আসছে। কয়েক মাস আগে সার্বজনীন প্রকাশ্য সমাবেশে নাগাল্যান্ডের পতাকা উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও নাগাল্যান্ডের পৃথক পতাকা আর স্বতন্ত্র সংবিধানের দাবি কেন্দ্র মানেনি।
বিভিন্ন নাগা স্বাধীনতাকামী সংগঠন ও নাগরিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ জানায়, তারা ভারতের চাপিয়ে দেওয়া সংবিধান মানবে না। তাদের দাবি, ভারত সরকার এবং এনএসসিএন (আইএম)-এর মধ্যে হওয়া আলোচনার ফলাফল সকলকে স্পষ্ট করে জানানো হোক। নাগাল্যান্ডের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবেত্তা ও পণ্ডিতদের দিয়ে নাগা সংবিধানের খসড়াও তৈরি করা দরকার। কারণ তা গোটা জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
এ বিষয়ে উভয়পক্ষের এই শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল আর এন রবির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকও করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
গত অক্টোবরে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলো। এরপর পার্শ্ববর্তী নাগাল্যান্ডে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিষয়টা এতোটাই প্রকট যে, প্রদেশটির গভর্নর আর এন রবি প্রদেশের শাসনভার নিজ স্কন্ধে তুলে নিয়েছেন। যেটি সাম্প্রতিককালে নজিরবিহীন ঘটনা। যদিও প্রথমে কোনও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আসেনি।
গভর্নর রবি উত্তর-পূর্ব ভারত শাসনের জন্য শাসনতন্ত্রের ৩৭১ অনুচ্ছেদের বলে প্রদেশে ক্ষমতাসীন ন্যাশনালিস্ট প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির সরকারকে অকার্যকর করে দিয়েছেন। এবং বহু প্রশাসনিক কতৃত্বও নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। বিজেপির সাথে নির্বাচনী জোট করে সরকার গঠন করা নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিউকে পাঠানো এক চিঠিতে সুবাদার আর এন রবি এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন।
গভর্নর গত ১৯ জুন সাড়ে তিন পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে (যা ২৫ জুন মিডিয়ায় ফাঁস হয়) স্বাধীনতাকামী ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অভ নাগালিম (এনএসসিএন-আইজ্যাক-মুইভা) ও অন্য সাত নাগা ন্যাশনালিস্ট পলিটিক্যাল গ্রুপের (এনএনপিজি) সাথে চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যস্ততাকারী ও অর্ধডজন সংঘবদ্ধ সশস্ত্র গ্রুপের উপর লুটপাটের অভিযোগ আরোপ করে লেখেন, তারা নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব সরকার পরিচালনা করছে।
প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী রিউর প্রতি গভর্নর অনেকটা সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দিক থেকে প্রতিরোধ ছাড়াই স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ এলাকায় সমান্তরাল সরকার কায়েম করে প্রাদেশিক সরকারের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শুধু তাই নয়, প্রদেশের জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বদলি ও পদায়নের সব কতৃত্ব গভর্নর নিজের অধীন করেছেন। সকল সরকারী কর্মচারীকে তাদের আত্মীয়স্বজনে থাকা বিদ্রোহীদের তথ্য সরকারের নিকট সোপর্দের আল্টিমেটামও দেয়া হয়েছে। সূত্র ডেকান হেরাল্ড।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, খোদ প্রাদেশিক সরকারকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার অভিযোগ এনে তার কতৃত্ব খর্ব করা হয়েছে, যেখানে এই সরকারের জোটসঙ্গী হিসেবে রয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি।
অন্যদিকে প্রাদেশিক বিজেপির নেতা ওয়াই প্যাটন উপ মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদায় স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্বে আছেন। আর একটি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে সমস্যগ্রস্ত প্রদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা তো নতুন করে বলার কিছু নয়। এক অর্থে নাগাল্যান্ডের সরকারের ব্যর্থতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই ব্যর্থতা। এখানেও বিজেপি সরাসরি অভিযুক্ত।