ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ বা উদযাপন। সামগ্রিক অর্থে ঈদ মানে খুশি,আনন্দ,প্রসন্নতা… যা বার বার আসে।ঈদ আমাদের মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব।হিজরি বর্ষপন্জী অনুযায়ী রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়। সূর্যাস্তে একফালি নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের পরিসমাপ্তি ঘটে আর সেই রাতটিকে ইসলামী পরিভাষায় লাইলাতুল জায়জা (পুরষ্কার রজনী) বা চাঁদ রাত বলা হয় আর পরদিন ঈদ হয়।
একটানা ৩০ দিন রোজা রেখে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে পরিবার ও সমাজের সকলকে নিয়ে পরম আবেগের সাথে একে অপরকে আলিঙ্গন করে আমাদের জীবনে নিয়ে আসে সীমাহীন আনন্দ আর আনন্দ…. আর এই দৃশ্য দেখেছি সেই ছেলেবেলা থেকে।সেই তো হওয়া উচিত। আমরাতো সবাই এই ঈদ, চাঁদ রাতের সাথে পরিচিত কিন্তু কোথায় যেন আমাদের শৈশবের ঈদ আর বর্তমানের ঈদের ফারাক দেখা যায়।
সেকালে ঈদের আমেজ আসতো ২৭ রমজান থেকেই।২৭ রমজান মানেই মনে হতো এই তো ঈদ চলে এলো।যার মেহেদী গাছ আছে তার গাছের মেহেদী পাতা শূন্য হয়ে পড়তো আর পরে থাকতো ঝাঁটার খিলের মতো ডালগুলো।পাটায় বাটা সেই মেহেদী পাতার যে সুঘ্রাণ আহা!!!নারীরা হাত ভরে সেই মেহেদী লাগাতো।আর এখন কেমিক্যালে ভরা টিউবের মেহেদী আমাদের হাতে শোভা পায়।
এখানে যেন কোথায় কৃত্রিমতার ছোঁয়া পাই।আমাদের বাচ্চারা সেই মেহেদী পাতার সুঘ্রাণের সাথে এখন আর তারা পরিচিত নয় বিশেষ করে সবাই মিলে বসে হাতে মেহেদী লাগানোর মজা তারা অনুভব করেনা।তারা এখন টিউব মেহেদী আর ঐ তথাকথিত মোবাইল বাক্স নিয়ে ব্যস্ত। আব্বা মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে রমজান ও ঈদের ছুটিটা কাটাতেন গ্রামের বাড়িতে আর সেই সুবাদে গ্রামের ঈদের আনন্দের স্বাদও নিয়েছি।
সেই সময় ঈদের ২/৩ দিন আগে থেকেই বাড়িঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন নিয়ে মহিলারা ব্যতিব্যস্ত থাকতেন ঠিক তেমনি গ্রামেও একই চিত্র দেখা যেত। তারা মাটির ঘর কাদা দিয়ে লেপতো ঈদকে কেন্দ্র করে। মোদ্দা কথা উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সকল শ্রেনির মাঝে ঈদের ২/৩ দিন পূর্ব থেকে ঈদের আমেজ বোঝা যেত।
আর এখন গ্রাম বলুন আর শহর বলুন রমজানের প্রথম থেকেই শুরু হয় ঈদের কেনাকাটা… ঈদে কার কত বাজেট এবং তা চাঁদ রাত অবধি চলে।চাঁদ রাত প্রসঙ্গ আসলো যখন তখন সেই সম্পর্কে বলি… ছেলেবেলায় ঈদের চাঁদ দেখা যাবার সাথে সাথেই কাজী নজরুলের সেই দরদ মাখা গান “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”… রেডিও টিভিতে বাজতে থাকতো.. আহা!!! সে এক বিশেষ অনুভূতি।
গানের সাথে সাথেই বাড়িতে ঈদের উৎসব শুরু হয়ে যেতো।আম্মা মজাদার আইটেম গুলো রান্না শুরু করতেন।আমরা রুমে রুমে সোফা,বালিশে নতুন নতুন কুশন কভার লাগাতে শুরু করতাম।গ্রামের ঈদেও দেখেছি অসহায় অতি দরিদ্র ছেলেরা যাদের হয়তো একটা নতুন জামা ভাগ্যে জুটতোনা তারাও মনের আনন্দে মশাল নিয়ে মিছিল করেছে ঈদ মোবারক বলে.. আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি তাদের আনন্দ আর আমরাও আনন্দ পেয়েছি।উল্টো দৃশ্যে দেখুন এখন চাঁদ রাত মানে কিছু শ্রেনীর বেহায়াপনা।
আপনারা অন্যভাবে নেবেননা।আমরা এখনও অনেক শ্রেনী আছি যারা সেই আগের ট্রাডিশনকে ধরে রেখেছি আর আমাদের সন্তানরাও যেন সেটাকে ধরে রাখবে আশা করি কিন্তু পরবর্তী জেনারেশনগুলো হয়তো তা পারবেনা।এখন চাঁদ রাতে সেই মন মাতানো নজরুলের গান “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে… শোনার জন্য হন্যি হয়ে চ্যানেলগুলো হাতড়ে বেড়াই।কোন সময় শুনতে পাই তো কোন সময় পাইনা।আমরা সেই চাঁদ রাত খুঁজে পাইনা।সন্তান,স্বামী, স্ত্রীরা যার যার রুমে লেখাপড়া, ল্যাপটপ,মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত।
খানাপিনা নিয়ে হাজারো আইটেম রান্না করে টেবিল ভর্তি কিন্তু কোথায় যেন সেই ঈদগুলোর শূন্যতা!!! এতো গেলো চাঁদ রাত এবার আসি ঈদের দিন।ঈদের সকাল.. ফজরের সময় উঠেই মায়ের সাথে বাহারি সেমাইসহ অন্যান্য রান্নায় সাহায্য, রুমে নতুন বেডকভার দেয়া নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ঠিক তেমনি গ্রামেও দেখেছি আমার দাদী,ফুপু সেই ভোররাত থেকে উনুনের ধারে তেলেপিঠা ভাজা নিয়ে ব্যস্ত,আশেপাশের বাড়িগুলো থেকেও সেই ভাজার সুঘ্রাণ আসতো।
ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে আব্বা,আমার তিন কাকা,আমার চাচাতো ভাই বোন সহ আমরা সকলে হেঁটে চলে যেতাম।আব্বা,কাকারা আমাদের কাজিনদের ( বোনদের) এক বিশেষ জায়গায় রেখে ঈদের নামাজ সম্পন্ন করতেন আর আমরা মাঠের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পাপড়,বাদাম এসব খেতাম আর নানাভাবে আমরা মজা করতাম।আর এখন… ঈদের দিন প্রায় অধিকাংশ বাড়ির প্রধান কর্ত্রী উঠে খাবার তৈরি করছেন আর অন্যান্য সদস্যরা ঘুমে কাতর।মনেই হয়না কোন উৎসবের দিন।কোনমতে যে যার মতো ঈদের নামাজ শেষে ঘরে ফিরে মিষ্টি মুখ করে আবার ঘুম আবার কেউ সেই শয়তানের বাক্স (মোবাইল) নিয়ে বসে যায়।
আর সেই সময় আমরা নতুন জামা পরে সবাই সবার বাসায় গিয়ে একটু হলেও মিষ্টি মুখ করতাম বা করাতাম আর এখন প্রতিবেশীদের মাঝে নেই কোন সংযোগ অবশ্য গ্রামে তা নয়।গ্রামে এখনও অনেকে একে অন্যের বাড়িতে যায় তবে আগের মতো আন্তরিকতার অভাব সেখানেও।আবার এখন ঈদে কেউ কেউ মোবাইলে কুশলাদি বিনিময় করেই শেষ আবার কেউ সেটারও প্রয়োজন মনে করেননা।নতুন জামাকাপড় প্রসঙ্গে বলতেই হয়.. ঈদের নতুন জামাকাপড়ের একটা ভিন্ন অনুভূতি ছিলো। নতুন জামা কিনে নিয়ে এসেই বাক্সবন্দি করা হতো।
কাউকে দেখা যাবেনা সেই নতুন জামা।একবার মৌলভীবাজার থাকাকালীন আমার খেলার সাথী সোহেলি আপা(আব্বার কলিগের মেয়ে) আমার নতুন জামা দেখে ফেলেছিলো বলে ভ্যা ভ্যা করে সেকি কান্না!!! আজও মনে আছে। সেই কান্নার অনুভূতিগুলো এখনও পেতে ইচ্ছে করে। এখন আপনার বাচ্চাদের হাজার হাজর টাকা দিয়ে ড্রেস কিনে দিলেও তাদের কাছে সেই অনুভূতি কাজ করেনা।
ঈদ সেলামি… আহা!!! সেও এক বিশেষ অনুভূতি।সেই সময় ২ টাকা/৫ টাকা নতুন নোট সেলামি পেতাম আর সেটাই যেন মনে হতো বিশাল কিছু হাতে এলো।সেই কড়কড়া নোটগুলো সংরক্ষন করতাম বহুদিন ধরে। অবশ্য আমার তিন কন্যাও আমার এই বিশেষ গুনটি বলবৎ রেখেছে।আর এখন ঈদের সেলামির প্রত্যাশা বেড়েছে বহুগুন…এখন তাদের বড় নোটের প্রত্যাশা।এখন ঈদ সেলামির ট্রাডিশন বজায় আছে ঠিকই কিন্তু ঈদ সেলামি প্রাপ্তির ভালোলাগার রেশটুকু তাদের মাঝে বিন্দুমাত্র নেই।
সেই সময় ঈদের দিনের আনন্দ যোগ হতো রাতে বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান আনন্দমেলা, ইত্যাদি আর হুমায়ুন আহমেদ এর বিশেষ নাটক দিয়ে।সেখানেও পরিবারের সবাই মিলে একসাথে টিভির সামনে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করতাম। এখন আর কেউ সেসবের তোয়াক্কা করেনা। এখন পরিবারের সবাই একসাথে সময় কাটানোর মত সময় নেই কারো।
যার যার মতো ঈদের আনন্দ পালন করে।জানিনা আপনারা আমার সাথে সহমত কি না।আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ঈদের আনন্দের প্রকৃত অনুভূতি হারাতে বসেছে।একালের ঈদের সাথে সেকালের ঈদের বিস্তর ফারাক। আমাদের সেকালের ঈদের আনন্দের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। মানছি এখন আধুনিক প্রযুক্তির যুগ কিন্তু তাই বলে কি আমাদের আনন্দ হারাতে বসবো???
আমাদের সবার সাথে সবার ভালোবাসা, আন্তরিকতা, বন্ধন এসব তো মজবুত রাখতে পারি অতি সহজেই আর এজন্য কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই শুধুমাত্র সবাই সবার প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠি,সবার জন্য একটু সময় দেই,সবার দোষত্রুটি গুলো উপেক্ষা করে নজরুলের গানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই… “আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন,হাত মেলাও হাতে।” চলুন, সবাই আমরা একটা খুশির ঈদ উপহার দেই একে অপরকে। সবাইকে পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক!!!!