কলেজে হিজাব পরা নিয়ে চরম বিতর্ক চলছে ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকে। গেরুয়া উত্তরীয় পরা যুবক ও হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের চরম উত্তেজনার মধ্যেই রাজ্যের সব স্কুল-কলেজ তিন দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যজুড়ে চলা উত্তেজনার মধ্যে বোরকা-হিজাব পরে কলেজ ক্যাম্পাসে এসে হয়রানির শিকার হয়েছেন এক ছাত্রী।
তবে গেরুয়া উত্তরীয় পরা একদল যুবকের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের সামনে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে অবিচল থেকেছেন ওই ছাত্রী। এ ঘটনার ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই তরুণীর নাম মুসকান খান। কর্ণাটকে মান্ডি এলাকার একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির বাণিজ্যিক বিভাগের ছাত্রী তিনি।
ভিডিওতে দেখা যায়, বোরকা-হিজাব পরে স্কুটি চালিয়ে কলেজে আসেন মুসকান। তখন গেরুয়া উত্তরীয় পরা যুবকেরা তার দিকে তেড়ে আসেন এবং ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেন। এ সময় মুসকান সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সামনে হেঁটে আসেন। পেছনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে যুবকদের আসতে দেখে মুসকান ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দেন। সেখানে মুসকানকে বাঁচাতে দুজনকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।
মুসকান এনডিটিভিকে বলেন, ওই যুবকদের বেশির ভাগ বহিরাগত। তারা কলেজের শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। হিজাব নিয়ে কলেজের হিন্দু বন্ধুরা কিছু না বললেও বহিরাগত যুবকরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন।
ওই সময়কার বর্ণনা দিয়ে মুসকান বলেন, আমি ভয় পাইনি। কলেজে ঢোকার সময় আমি বোরকা পরা দেখে তারা আমাকে ঢুকতে দিতে চাইছিল না। তারা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে থাকলে আমি ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে শুরু করি। কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রভাষকেরা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন এবং আমাকে সুরক্ষা দিয়েছেন।
গেরুয়া উত্তরীয় পরা যুবককের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের কাছে শিক্ষার প্রাধান্য সবার আগে। কিন্তু তারা আমাদের শিক্ষা ধ্বংস করে দিতে চাইছে। আমরা হিজাব ও বোরকা পরে বহুদিন ধরেই কলেজে আসছি। কিন্তু হিজাব বিতর্ক গত সপ্তাহে শুরু হয়েছে। এই কলেজছাত্রী বলেন, হিজাব আমাদের একটি অংশ। মুসলিম মেয়ে হিসেবে এটা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা হিজাব রক্ষার অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাব।
প্রসঙ্গ, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উদুপির গভর্নমেন্ট গার্লস পিইউ কলেজে ছয় ছাত্রীকে মাথায় হিজাব পরে আসায় ক্লাসে ঢুকতে দেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই দিন থেকে আন্দোলন শুরু হয়, ক্রমে তা রাজ্যের অন্য স্কুল-কলেজগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে উদুপি এবং চিক্কামাগালুরে ডানপন্থী সংগঠনগুলো ছাত্রীদের হিজাব পরে কলেজে প্রবেশের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিবাদ জানাতে থাকে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে কলেজে সংঘর্ষও হয়। হিজাব ইস্যুতে রাজ্যের বহু স্কুল-কলেজে বিক্ষোভ এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কর্ণাটক হাইকোর্টে একটি মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার এ মামলার শুনানি চলে। বুধবারও (৯ ফেব্রুয়ারি) শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
হিজাব ইস্যুতে প্রতিবাদে শামিল প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকে চলমান ‘হিজাব ইস্যু’ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে মুখ খুলেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। বুধবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষার্থীদের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে একটি পোস্ট দেন তিনি।
তাতে প্রিয়াঙ্কা লিখেন, নারীরা কোন ধরনের কাপড় পরবেন, সেটি তাদের একান্ত ব্যক্তিগত এবং সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত অধিকার। তিনি আরও লিখেন, একজন নারী কী পরতে চায় তা তার নিজস্ব ব্যাপার। তা হতে পারে বিকিনি, ঘোমটা, জিন্স কিংবা হিজাব। এটি ভারতীয় সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা অধিকার।
ওই পোস্টে ‘নারী হয়েও প্রতিবাদ করতে জানি’ শীর্ষক হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেন তিনি। হ্যাশট্যাগটি বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) শুরু হতে যাওয়া উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে কংগ্রেসের সাত দফার একটি দাবি। প্রিয়াঙ্কার নেতৃত্বে নির্বাচনী প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে নারীর অধিকার এবং ক্ষমতায়নের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কংগ্রেস।
এর আগে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের হিজাব পরার সমর্থনে টুইট করেন। হিজাব ইস্যুতে আলোচনায় আসা মুসকান খান নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, আমি বোরকা পরে ছিলাম বলে তারা আমাকে কলেজে ঢুকতে দেয়নি। তারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কর্ণাটকে হিজাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তখন উদুপির গভর্নমেন্ট গার্লস পিইউ কলেজের ছয়জন ছাত্রী অভিযোগ করে তাদের শ্রেণিকক্ষে হিজাব পরতে নিষেধ করা হয়েছে। এই ইস্যুতে অনেক কলেজ শিক্ষার্থীকে গেরুয়া কাপড় পরে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
তবে একমাস আগে ‘হিজাব নিষেধাজ্ঞা’ নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়। মঙ্গলবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি নিয়ে কর্ণাটক হাইকোর্টে শুনানি হয়। এ নিয়ে তৈরি হয় ব্যাপক উত্তেজনা। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে রাজ্যে তিন সব স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন মুখ্যমন্ত্রী বাসভরাজ এস বোম্মাই।