দিন যত যাচ্ছে ততই ভয়ংকর হচ্ছে জলবায়ু সংকট। ২০২১ সালে বছরজুড়েই নজিরবিহীন সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছে বিশ্ব। বিশেষ করে দাবানল। ইউরোপের সাইবেরিয়া থেকে আফ্রিকার আলজেরিয়া পর্যন্ত আতঙ্ক ছড়িয়েছে দেশে দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড়-বন্যা-দাবানল এখন নিয়মিত ঘটনা। কানাডায় দাবদাহ-দাবানলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে পুরো শহর। প্রথমবারের মতো বৃষ্টি হয়েছে গ্রিনল্যান্ডে। চলতি বছরই যুগান্তকারী এক রিপোর্টে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানান, ক্রমবর্ধমান এই জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য মানুষই দায়ী।
বিশ্ব এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে এগোচ্ছে জেনেও জলবায়ুর ব্যাপারে গত কয়েক বছর ধরেই উদাসীন বিশ্বনেতারা। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার ওয়াদা করেও তা পূরণ করেননি। যুক্তরাষ্ট্রকে আবার প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরিয়ে এনেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই স্টকল্যান্ডের গ্লাসগোতে হয়ে গেল জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ২৬। আশা জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত এই কপ২৬ও ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা। তাদের মতে, পূর্বসূরিদের মতো অপমৃত্যু ঘটেছে কপ২৬-এরও। তাই গোরস্থানে এর প্রতীকী দাফন করা হয়েছে।
আগের ২৪টি সম্মেলনের মতোই কপ২৬-এও বড় বড় প্রতিশ্রুতি ও ফাঁকা বুলিই আওড়িয়েছেন নেতারা। পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় কারণ তেল-গ্যাস-কয়লার ব্যবহার ছাড়তে পারেনি। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মানুষের বসবাসের উপযোগী গ্রহ পৃথিবী ২.৪ ডিগ্রির বৈশ্বিক তাপমাত্রার পথেই রয়েছে। যেখানে তাপমাত্রাকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে যা ঘটার তাই ঘটছে। জলবায়ু বদলের বাজে প্রভাব হিসাবে বিশ্ব কখনো বন্যায় ডুবছে, কখনো দুমড়ে-মুচড়ে
যাচ্ছে প্রচণ্ড ঝড়ে। কখনো আবার গরমে হাঁসফাঁস, আবার কখনো পুড়ে খাক। ২০২১ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। গত ১২ মাসের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই বড় বড় অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ভয়ংকর ৮ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিচে তুলে ধরা হলো- বরফের রাজ্য গ্রিনল্যান্ডে বিরল প্রবল বৃষ্টিপাত : ১৪ এবং ১৫ আগস্ট তুমুল বৃষ্টিপাত হয় গ্রিনল্যান্ডের পুরু বরফের চাদরের শৃঙ্গে। এতটা বৃষ্টিপাত আধুনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের দেওয়া পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত ডেনমার্কের এই বরফদ্বীপে দুদিনের বৃষ্টিতেই পুরু বরফের চাদরের শৃঙ্গের ওপর আছড়ে পড়ে ৭০০ কোটি টন ওজনের পানি। কোনো তুষারপাত হয়নি ওই দুদিন। শুধুই হয়েছে বৃষ্টিপাত। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে।
আমেরিকার ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টার জানাচ্ছে, ওই দুদিনে তুমুল বৃষ্টিপাতে গ্রিনল্যান্ডের পুরু বরফের চাদরের আট লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার বরফ গলে গেছে। সেন্টারের বিজ্ঞানী টেড স্ক্যামবস বলেন, ‘দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই এটা হয়েছে। এটা অভূতপূর্ব ঘটনা। আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে বিরল।
বেঁটে হয়ে যাচ্ছে সুইডেনের সর্বোচ্চ পর্বশৃঙ্গ: সুইডেনের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে। বেঁটে হয়ে যাচ্ছে। পর্বতশৃঙ্গ কেবনেকেইজ হিমবাহের বরফ খুব দ্রুত গলতে শুরু করেছে। তার ফলে কেবনেকেইজ হিমবাহের শৃঙ্গের উচ্চতা গত এক বছরে সাড়ে ৬ ফুট কমে গেছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (এসা)-র পাঠানো ভূপর্যবেক্ষণ উপগ্রহ ‘সেন্টিনেল-২’ গত ২৮ জুলাই কেবনেকেইজ হিমবাহের শৃঙ্গের যে ছবি পাঠায় তাতেই তার উচ্চতা কমে যাওয়ার কথা জানা যায়। বিজ্ঞানীরা জানান, উষ্ণায়নের জন্য কেবনেকেইজ হিমবাহের বরফ খুব দ্রুত গলতে শুরু করায় উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
‘ডিপ ফ্রিজ’ টেক্সাস : যুক্তরাষ্ট্রে শীতকাল শুরু হয় ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে। চলতে থাকে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু এবার যে শীত পড়েছে তা ইতিহাসে কমই দেখা গেছে। তুষারপাত আর শৈত্যপ্রবাহে টেক্সাস রীতিমতো জমে যায়। যেন ‘ডিপ ফ্রিজে পরিণত হয়’ পুরো রাজ্য। শুধু টেক্সাসই নয়, প্রায়ই একই রকম ঠান্ডা অনুভূত হয় মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতেও। ফেব্রুয়ারির ১৫ থেকে শুরু হয় প্রবল শৈত্যপ্রবাহ ও তৃষারপাত। একটানা চলতে থাকে কয়েক দিন। ফলে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ২৮ ডিগ্রিতে।
টেক্সাসের বিদ্যুৎ উৎপাদন থমকে যায়। ৪৪ লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সরকারি হিসাবে প্রচণ্ড ঠান্ডায় মারা যায় দুই শতাধিক মানুষ। তবে গণমাধ্যমের দাবি, ৫০০ থেকে এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তিন মহাদেশজুড়ে প্রবল বন্যা : মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিন মহাদেশজুড়ে দেখা দেয় একের পর এক ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক বন্যা। মধ্য জুলাইয়ে অতিবৃষ্টিপাত থেকে সৃষ্ট বন্যা রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পশ্চিম ইউরোপে।
নজিরবিহীন বন্যার কবলে পড়ে চীনের হেনান প্রদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্য। প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জার্মানি ছাড়াও বেলজিয়াম, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস এবং সুইৎজারল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশজুড়ে এই বন্যা দেখা দেয়। এতে দুইশ’র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু জার্মানিতেই মারা যায় শতাধিক। রেকর্ড বৃষ্টিপাতে চীনের হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝেংঝু শহরের বেশির ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ মারা যায়। একইভাবে অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় টেনেসিতে ২৭০টি বাড়ি ধ্বংস হয়। মারা যায় দুই ডজনের বেশি মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড় ইদার তাণ্ডব : আগস্টের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিন্সের উপকূলে আঘাত হানে প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড় ইদা। ক্যাটাগরি ৪-এর ঝড়টি তাণ্ডব চালায় অন্তত চার রাজ্যজুড়ে। নিউ অরলিন্সের বড় বড় গাছগুলো পর্যন্ত শিকড় সমেত উপড়ে যায়। তছনছ হয়ে যায় লুইজিয়ানার বহু ঘরবাড়ি। ছাদ উড়ে যায় মিসিসিপির বহু হাসপাতালের। রাজ্যের ১০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্ট প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত আর বন্যায় নিউ জার্সির বহু এলাকা তলিয়ে যায়। মারা যায় প্রায় একশ’ মার্কিনি।
৬ মার্কিন রাজ্যে ৩০ টর্নেডোর আঘাত, নিহত ১০০ : ইদার আগাতের ক্ষত শুকাতে না শুকাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকবার আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়। একটা দুইটা নয়, একসঙ্গে ৬ রাজ্যে ৩০টিরও বেশি টর্নেডো। বছর শেষ হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে (১২ ও ১৩ ডিসেম্বর) বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয় কেনটাকি, আরকানসাস, ইলিনয়স, মিসৌরি, মিসিসিপি ও টেনেসি। এতে মারা যায় অন্তত ১০০ জন। ক্যাটাগরি ৫ ঘোষিত একাধিক টর্নেডো প্রায় ২০০ মাইল (৩২২ কিলোমিটার) আঘাত হানে কেনটাকিতে। ছোট-বড় অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ে।
হাজার হাজার ঘরবাড়ি-দোকান মাটির সঙ্গে মিশে যায়। কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার বলেন, ‘আমি এমন বিধ্বংসী ঝড় দেখিনি।’ টর্নেডোতে এই রাজ্যে মৃত্যু হয় প্রায় ৭০ জনের। কানাডায় প্রচণ্ড দাবদাহ, মৃত্যু দুই শতাধিক : শীতপ্রধান দেশ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এমন দাবদাহ দেখা দেয় যা আগে কখনো অনুভূত হয়নি। পুরো অঞ্চলে রেকর্ড গড়ে তাপমাত্রা। বিশেষজ্ঞরা জানান, এমন তাপমাত্রার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন এই এলাকার অধিবাসীরা। অনেকের বাড়িতেই এয়ার কন্ডিশন ব্যবস্থা নেই।
ফলে অধিক তাপমাত্রায় অসুস্থ হয়ে মারা যায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। অত্যধিক তাপমাত্রা ও দাবদাহের জেরে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় দাবানলে সৃষ্টি হয়। যার ফলে প্রদেশের লিটন শহর পুড়ে কয়লা হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়েছেন প্রাদেশিক প্রধান। খরা, দাবানল ও পানির ঘাটতি : বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ২০২১ সালে নজিরবিহীন প্রলম্বিত খরা, দাবানল আর পানি ও খাদ্য ঘাটতির মুখেও পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু সংকটের ‘স্পষ্ট লক্ষণ’ বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যালিফোর্নিয়ায় এবারের গ্রীষ্মকালীন খরা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ যা গত ১২৬ বছরের রেকর্ড। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০২১ সালের জুলাই ছিল সবচেয়ে শুষ্কতম মাস। আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমের এই রাজ্যের ৯৫ শতাংশ অধিবাসীই খরার ঝুঁকিতে ছিলেন। খরা পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুই প্রাকৃতিক জলাধার লেক মিড ও লেক পোয়েলের পানিও আশঙ্কাজনক হারে শুকিয়ে যাচ্ছে। শুধু খরাই নয়, ভয়াবহ দাবানলও প্রত্যক্ষ করেছে ক্যালিফোর্নিয়া। রাজ্যের পার্বত্য এলাকায় গ্রিনভিল নামের একটি শহর। শহরটির নামের সঙ্গে সবুজ যুক্ত থাকলেও এখন আর এটি সবুজ নেই।
চলতি সপ্তাহে ভয়াবহ দাবানলে ছারখার হয়ে যায় এর বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চল, সাইবেরিয়া, ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল তথা গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স ও তুরস্কের বিস্তীর্ণ এলাকা দাবানলে পুড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০০৩ সালের পর চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এমন দাবানল বিশ্ব আর দেখেনি। তীব্র দাবদাহ ও দীর্ঘ খরার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দাবানল সৃষ্টি হয়েছে। এতে বনাঞ্চল ও তৃণভূমি পুড়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে ৩৪৩ মেগাটন কার্বন নিঃসরণ হয়েছে; যা পরিবেশের সুরক্ষায় বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: যুগান্তর