নাহার তালুকদার/ সাগর হোসেন: সম্প্রতি ক্রাইম আপডেট নামে ফেসবুক একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বলে বিভিন্ন যায়গায় চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছেন মিরপুরের ভুয়া সাংবাদিক দ্বীন ইসলাম।
জানা যায় , ওই মেসেঞ্জার গ্রুপ টি তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ওটার নাম ভাঙ্গিয়ে পুলিশ, তৃণমূলের সাংবাদিক, পুলিশ সদস্য সহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করেন। ওই চাঁদাবাজির সহযোগিতায় তিনি মূল ধারার গণমাধ্যমকর্মীদের নাম ভাঙ্গিয়ে এ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
মিরপুর পল্লবী এলাকার সাধারণ মানুষের তথ্য মতে জানা যায়, দ্বীন ইসলাম বর্তমান ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক তিনি ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির মেম্বার সেই সাথে বিভিন্ন জায়গায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে দাবি করেন।
প্রেসক্লাব সংবাদকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, ভুয়া সাংবাদিকের সঙ্গে দীর্ঘ অনেকদিন ধরে চলাফেরা করেন দ্বীন ইসলাম। মূলত তিনি মূল ধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বাইরে। সাংবাদিক টিটোসহ বেশ কয়েকজন কথিত সাংবাদিক মিলে আড্ডা দেন। আড্ডার সময় বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজির নানান গল্প আলোচনা করেন তারা। বড় মাপের চাঁদাবাজির শেষ করে তিনারা জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় এসে চায়ের আড্ডা দেন।
জানা যায়, সেই চায়ের আড্ডায় মূল ধরার সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকলে তাদেরকে চা খাইয়ে পরিচয় হন়। এবং পরবর্তীতে তাদের নাম বিক্রি করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করে থাকেন তারা। যেমন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক জনপ্রিয় সদস্য গোলাম মুজতবা ধ্রুব নাম বিক্রি করে টিটো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ধান্দা ফিকির করে থাকেন।
মিরপুর পল্লবী এলাকার রাজু নামে এক ব্যক্তি বলেন, দ্বীন ইসলাম বিভিন্ন সময় বড় বড় সাংবাদিক ও তারকা সাংবাদিকদের কথা বলেন। মাঝে মাঝে সাংবাদিক নেতা শাবান মাহমুদ তাকে ফোন দেন এসমস্ত বলে মিরপুর এলাকা চোষে বেড়ায় ও বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেন।
মিরপুর এলাকার মুন্না ইকবাল নামের এক যুবলীগ নেতা বলেন, দ্বীন ইসলাম বেশ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক। পাশাপাশি সোনালী খবর নামে একটা পত্রিকায় কাজ করেন। আমি একদিন তার কাছে বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলে আমাকে বলেন বাংলাদেশের কোন সাংবাদিক বেতন পান না। সবাই আমার মতন কষ্ট করে চলে।
রূপনগর এলাকার বিপুল হোসেন বলেন, আমাদের মিরপুর এলাকার এক সাংবাদিক আছে দ্বীন ইসলাম। তিনি অনেক দিন সাংবাদিকতা করেন বেশ কয়েকটি পত্রিকার মালিক সে কিন্তু তাকে দেখলে মনে হয় রাস্তা থেকে উঠে এসেছে। মাঝে মাঝে আমার টাইলসের দোকানে আসতো অনেক ফাজলামি করছ আমি নাকি টাইলসের দাম বেশি রাখি এজন্য সংবাদ করতে চেয়েছিল আমার বিরুদ্ধে। আমি বলেছিলাম যা ইচ্ছে তাই করেন এরপর আর এখানে আসেনি।
মিরপুর সাংবাদিক প্লট এলাকার একাধিক সূত্রে জানা যায়, অত্র এলাকায় যখন বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো প্রোগ্রাম হয় তখন দ্বীন ইসলাম নিজে একটি ক্যামেরা নিয়ে আসে এবং তার সঙ্গে অনেক সাংবাদিকরাও আসে। সে মাঝে মাঝে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলে এবং প্রোগ্রাম শেষে পরবর্তী সময়ে সেই ছবি পত্রিকায় দিয়ে মানুষের কাছ থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা (তার অধিক) পর্যন্ত নেন।
তথ্য মতে জানা যায়, মিরপুর এলাকার মদ গাঁজা ইয়াবা ও হোটেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক হারে চাঁদা নেন তিনি।যারা চাঁদা দিতে চান না তাদের বিরুদ্ধে সোনালী খবর পত্রিকায় বড় করে সংবাদ প্রকাশ করেন। সংবাদ প্রকাশের পর অনেকে মান ইজ্জতের ভয়ে তাকে মাসোহারা দেন এটাই দিয়েই তিনি জীবন জীবিকা নির্ভর করেন।
একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সে একজন অর্ধ শিক্ষিত মানুষ। কম শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে তেমন কোনো কাজকর্ম না পাওয়ায় ৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে নিয়ে নেন সাংবাদিকতার কার্ড। এমন ভুয়া ও কথিত সাংবাদিকতা করার কারণে তার নামে মামলা ও রয়েছে।
মিরপুর এলাকার বেশকিছু সাংবাদিকদের তথ্য মতে, দ্বীন ইসলাম যে সাংবাদিকতা করে সেটি কোন মূল ধারার সাংবাদিকতা নয়! এটাকে অপসাংবাদিকতা বলে, সে মূলত অপসাংবাদিকতায় করে এমন অপসাংবাদিক যদি মূল ধারার সাংবাদিকদের নাম ভাঙ্গিয়ে চলে তাহলে সাংবাদিক সমাজের বদনাম হয়।
তাদের দাবি, যার কারণে দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সাংবাদিক সমাজের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।সেটি না হলে সাংবাদিক সমাজের বদনাম দিন দিন আরো বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
ওই সাংবাদিকরা আরো জানান, দ্বীন ইসলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি অথবা বাংলাদেশ ক্রাইম এসোসিয়েশন (ক্র্যাব), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, অথবা প্রেসক্লাবসহ যে সকল সংগঠনের পরিচয় দেন সেটার কোনটির মেম্বার নয়। মাঝে মাঝে দেখি প্রেসক্লাবের কোনায় বসে কিছু কথিত সাংবাদিকদের সঙ্গে চায়ের আড্ডা দেন। তার মানে এটা হয় না, যে সে সকল সংগঠনের সদস্য এ কারণে আমাদের সংগঠনগুলো মাঝে মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
মিরপুর এলাকা ঘুরে দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, মিরপুরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিটের বিভিন্ন সংগঠনের ও আ. লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেছেন তিনি। ছোট-বড় সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হন।
এলাকাবাসী তথ্য মতে, অনেক ছেলে মেয়েকে সাংবাদিক বানিয়ে দিবেন বলে তাদের কাছ থেকে কার্ড দেওয়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। সেই সাথে পরিচিত নেতাকর্মী ও মাদক সেবন কারীদের সঙ্গে নারী দিয়ে দেহ ব্যবসায় হল মূলত তার কর্ম। টিকে থাকার জন্য তৈরি করেছেন প্রাইম আপডেট ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ।
এলাকাবাসী জানান, দ্বীন ইসলাম নিজেও একজন অপরাধী, মেয়ে দিয়ে ব্যবসা করেন পরবর্তীতে তার বন্ধু-বান্ধব অথবা পরিচিত লোকজন তার সঙ্গে কোনো ধরনের যায় ঝামেলা করলে সেই মেয়ে দ্বারা যৌন সম্পর্ককৃত ভিডিও দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।
এদিকে দ্বীন ইসলামের অপসাংবাদিকতা মিরপুরের সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। দ্বীন ইসলাম অনেক থানার অফিসার ইনচার্জ কে লাইনে না আনতে পারলেও থানার এসআই, এসআই ও কনস্টেবল কে লাইনে এনে বিভিন্ন ধরনের তদবির ধান্দা ফিকির করেন।
তথ্যমতে, কথিত এই ভুয়া সাংবাদিক সম্প্রতি বেশ কয়েকদিন আগে তুহিন নামের একজনের পরকীয়ার ভিডিও ধারণ করে একটি স্বর্ণের চেইন ও একটি আর আংটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেন। এরপর ওই ভিডিও তার স্ত্রীকে দেখাবে এমন ভয়দিয়ে তার কাছ থেকে নতুন রূপে আবার ১০ হাজার টাকা নেন।
তুহিন জানান, সর্বশেষ তারা একটি সিন্ডিকেট মিরপুরে অবস্থান নিয়েছেন। তৈরি করেছেন মিরপুর প্রেসক্লাব। মিরপুরের বিভিন্ন সাংগঠনিক সাংবাদিক ইউনিটি যা মূল ধারার গণমাধ্যমকর্মীদের অনেক বাইরে। তুহিন নামের ওই ব্যক্তি আরো জানান, দ্বীন ইসলাম ও তার সিন্ডিকেট ওই ভিডিওটি এখনও ডিলিট করেননি এরপর ভিডিও ডিলিট বাবদ নতুন রূপে আবার ৫ হাজার টাকা নিয়ে তার কাছে ভিডিওটি হস্তান্তর করেন।
তুহিন বলেন , আমি ভুল করেছি দ্বীন ইসলাম সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়েছে না পেরেছি আইনের সহযোগিতা নিতে না পেরেছি অন্য কারো সহযোগিতা নিতে বাধ্য হয়ে তাদের কাছে আমার ফিটিং এ পড়তে হয়েছে।
তুহিনের আরেক বন্ধু বলেন, মাস দুয়েক আগে দ্বীন ইসলাম ও তার সিন্ডিকেট আমার নান্নু মার্কেট এর অফিসের সামনে ছিনতায়ের মত একজনকে সার্চ করছে। বিষয়টি আমি দেখতে পাই আমি এগিয়ে গেলে সে বলে এখানে আপনার কি? দ্বীন ইসলাম বেশিরভাগ মোহনা টেলিভিশনের অপজিটে আড্ডা দেন সেখান থেকেই তার শিকড়ের জন্ম হয়। বলা যায় দ্বীন ইসলাম মিরপুরে একটি গ্যাং তৈরি করেছেন। মূলত এ গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
মিরপুর এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে দ্বীন ইসলাম যদি আইনের অধীনে না যায় তাহলে সাধারণ মানুষ প্রতিষ্ঠিত হয় পড়বে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির বর্তমান নেতৃবৃন্দরা জানান, সোনালী খবরের কেউ আমাদের এখানের সদস্য না তাছাড়া দ্বীন ইসলাম নামে আমরা কাউকে চিনিনা সম্ভবত সে ভুয়া সাংবাদিক। এমন সাংবাদিককে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ঠাঁই দেয় না।
সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে রফিক রাফি কে নিয়ে তিনি তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন যে কারণে তিনি ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সদস্য হিসেবে দাবি করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির নেতৃবৃন্দরা বলেন, কে কাকে দিয়ে পোস্ট দিল সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে এতোটুকু আমরা বলতে পারি সে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সদস্য না। এমন প্রশ্নবিদ্ধ মানুষকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কখনো জায়গা দেয় না।
এ বিষয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে তারা জানান, কত মানুষ কত রকমের পত্রপত্রিকা খুলে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করছে । তার মধ্যে দ্বীন ইসলাম পড়তে পারে। এমন অপসাংবাদিকতা ঠেকাতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন কাজ করছে। অনেক মানুষ প্রেসক্লাবে এসে চায়ের আড্ডা দেয় তাদেরকে আমরা নিষেধ করতে পারিনা। তবে সে যদি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের পরিচয় দেয় তাহলে সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দ্বীন ইসলাম বলেন, ক্রাইম আপডেট নামে একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলেছি সেখানে অনেক বড় বড় সাংবাদিকরা আছে। সবাই আমাকে চেনে। আমি মিরপুর এলাকায় থাকি সোনালী খবরে কাজ করি।
অফিস আপনাকে কত টাকা স্যালারি দেয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোন অফিস সাংবাদিকদের বেতন দেয় না। আপনি বলতে পারবেন আপনার অফিস আপনাকে কয় টাকা দেয়। বরং একটা নিউজ করে ১ হাজার টাকা পেলে সম্পাদককে ৫০০ টাকা দেওয়া লাগে। যেটা আমিও করি আপনিও করেন।
এটা কি সাংবাদিকতা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বড় নেতা পত্রিকা খুলে সাংবাদিকদের বেতন দেয় না। তার মতন বড় সাংবাদিক যদি সাংবাদিকদের বেতন না দেয়, তাহলে অন্য কোন পত্রিকার সাংবাদিকদের বেতন দিবে না এটা স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে বলা যায় কোন সাংবাদিক কোন অফিস থেকে বেতন পাই না তারা নিউজ এর উপর নির্ভরশীল। কে কয়টা নিউজ দিল সেই নিউজ এর উপর মাসিক বেতন পায়।
অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোন অপরাধ করি না। আমি সাংবাদিক দ্বীন ইসলাম প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সবাই জানে আমাকে সবাই চেনে। আপনাকে আমি চিনি না, যদি চিনতাম তাহলে ক্রাইম আপডেট গ্রুপে আপনি যুক্ত থাকতেন। আপনি ৫-৭টা হাউজে কাজ করেন কিভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটা সাংবাদিক ইচ্ছা করলে ১০ জায়গায় কাজ করতে পারে।
নতুন সময়/টিআইভি