মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ৭৪তম স্বাধীনতা দিবস পালন করলেন কোভিড–যোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে, আর রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় দিনটি পালন করলেন রাজ্য সরকারের প্রতি মিথ্যাচার এবং অভিসন্ধিমূলক অভিযোগে। মুখ্যমন্ত্রী পেয়েছেন ২৫ চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, সাফাইকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, আধিকারিক, কোভিড–যোদ্ধার শ্রদ্ধা। আর রাজ্যপাল পেয়েছেন সাধারণ মানুষের অবজ্ঞা, রাজনৈতিক মহলের শ্লেষ এবং তৃণমূল নেতাদের তীব্র সমালোচনা।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শনিবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসূচিটি ছিল প্রকৃত অর্থেই ‘ঐতিহাসিক’। তিনি এমন ২৫ কোভিড–যোদ্ধাকে ওইদিন সম্মান জানিয়েছেন, যঁারা করোনায় আক্রান্ত হয়েও সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন নিজেদের কাজে। দেশে একমাত্র এই রাজ্যেই স্বাধীনতা দিবসে এমন একটি অনুষ্ঠান পালিত হল। রাজ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ব্যঙ্গের সঙ্গে বলেছেন, সে অর্থে রাজ্যপালও ‘ঐতিহাসিক ভূমিকা’ পালন করলেন। এর আগে স্বাধীনতা দিবসে এমন ক্ষুদ্র রাজনীতি দেশের কোনও রাজ্যপালই করেননি।
রেড রোডের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ছিল সংক্ষিপ্ত। নিয়মমাফিক মুখ্যমন্ত্রী অভিবাদন গ্রহণ করেন। মার্চ পাস্টে থাকা সকলেই ছিলেন বিধি মেনে মাস্ক পরে। ট্যাবলোয় অংশগ্রহণকারীদের পরনেও ছিল পিপিই। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেছেন সকলেই। স্বাধীনতা দিবসে মুখ্যমন্ত্রী টুইট করে বলেছেন, ‘যে নীতি এবং আদর্শের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা এসেছিল, সেই আদর্শকে সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে।’
রেড রোডের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, ইন্দ্রনীল সেন, রাজ্যের মুখ্য সচিব রাজীব সিনহা, স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, কলকাতার নগরপাল অনুজ শর্মা। মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সুরে গান বাজে। ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ ট্যাবলোয় ছিল: ‘মাস্ক পরুন, করোনা দূর করুন’। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের একটি ট্যাবলোয় ছিলেন বাউল শিল্পীরা। তাঁরা সকলে পিপিই পরে ছিলেন।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের ট্যাবলোয় লেখা ছিল: ‘করোনা হারবে, বাংলা জিতবে’। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন। তিনি সেখানেই জানান, রাজ্য সরকার ৫ লক্ষ মাস্ক বিতরণ করবে। অনুষ্ঠানের পর মুখ্যমন্ত্রী যান রাজভবনে। সেখানে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে তাঁর ঘণ্টা দেড়েকের বৈঠক হয়।
রাজভবন থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস, এই দুটো দিনই আমাদের কাছে খুব পবিত্র দিন। আমরা দিন দুটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করি। আমি বিকেলে রাজভবনে চা–চক্রে থাকতে পারব না। তাই এখনই চলে এলাম। আমার সঙ্গে মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ডিজি, রাজ্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা, কলকাতার নগরপাল ছিলেন। রাজ্যপালের সঙ্গে কথা বলে গেলাম। তাঁকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছাও জানিয়ে গেলাম।’
এমন একটা শুভেচ্ছা বিনিময় সাক্ষাতের পরেও রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় মুখ্যমন্ত্রী এবং সরকারের উদ্দেশে বিষোদ্গার করতে পিছপা হননি। যথারীতি ফের টুইট। শুধু তা–ই নয়, পরে অভিযোগ করেন, রাজভবনের ওপর নজরদারি রয়েছে। এ ছাড়াও তঁার অভিযোগ, এই রাজ্যে নাকি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয় না। মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুষ্পস্তবক নেওয়ার পরও রাজ্যপালের এই উদ্ভট অভিযোগে রাজ্যের মানুষ হতভম্ব হয়ে যান। তৃণমূলের মহাসচিব, মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি বলেছেন, ‘ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বাংলার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি অনেক, অনেক ভাল।
নির্বাচন কীভাবে হবে, তা তো নির্বাচন কমিশন দেখবে। রাজ্যপাল তো দেখবেন না। তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যেও পড়ে না। তাঁকে এখনও বলছি, আপনি এ সব মন্তব্য করবেন না। পদের অমর্যাদা করা থেকে বিরত থাকুন।’ সাংসদ সৌগত রায় বলেন, ‘রাজ্যপালকে বহুবার বলা হয়েছে প্রশাসন সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে চিঠি লিখুন। প্রতিদিন টুইট করছেন। কিছুতেই কথা শুনছেন না। বলা হচ্ছে, প্রকাশ্যে প্রশাসন সম্পর্কে মতামত দেবেন না।
রাজ্যপালের পদে থেকে এটা করা যায় না।’ সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেছেন, ‘আঙ্কল, আপনি বলেছেন রাজভবন নজরদারিতে আছে। আপনার গুজরাটে বসে যারা এ সব করে, আমরা তাঁদের কাছে নগণ্য। আঙ্কল, দয়া করে সত্যি কথাটা বলুন।’ বনমন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শনিবার সকালে রাজ্যপালের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে এসেছেন। এক ঘণ্টা ছিলেন। তার পর এত প্রশ্ন উঠছে কী করে?’
সূত্র: আজকাল