কোভিড-১৯, বিশেষ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক অটিস্টিক শিশুর যত্নে সহায়তাকারীর ভূমিকা
ডাঃ সেলিনা সুলতানা: “অটিজম” মানসিক বিকাশ জনিত একটি সমস্যা, যা শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। জাতিসংঘ ২রা এপ্রিলকে” বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ২০০৮ সাল থেকে। এবারে “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস” এর মূল মনোযোগের বিষয়টি ছিল “transition to adulthood” অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কে রূপান্তর। অটিজমে আক্রান্ত একজন শিশুর কৈশোর পার করে প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত করা এবং তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিভিন্ন ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে তার দক্ষতা এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সময় উপযোগী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে,তার আয় ও উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেঁচে থাকা, স্বাধীনতা দেয়া বা ক্ষমতা দেয়া এটাই ছিল এ দিবসের মূল বিষয়বস্তু ।
আমাদের দেশের অনেক সংস্থা বা সেন্টারগুলো এই নিয়ে অনেক কাজ করছে। শিশু থেকে কৈশোর-যৌবন এবং তাদের প্রাপ্তবয়স্ক রূপান্তরিত করে কাজের উপযোগী করে তৈরি করে দিচ্ছেন।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ ও চাকরি দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলাই এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ।
এসব মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে সমাজের আর দশজনের মতোই যেন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে ।পরিবারের বা সমাজের বোঝা না হয়ে থাকে তার ব্যবস্থা করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি শিশুটিকে Early Intervention দিয়ে মূলধারায় নিয়ে আসা যায় ততো তাড়াতাড়ি শিশুটি এসব কর্মকান্ডের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায় বা শিখে যায়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমনের সময় সাধারণ শিশুদের তুলনায় বিশেষ শিশুরা বেশি কঠিন সময় পার করছে ।
স্বাভাবিক শিশুদেরই অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতিতে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে সেখানে বিশেষ শিশুরা, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষক এ কার্যক্রমে অভ্যস্ত হতে একটু বেশি সমস্যায় পড়েছেন ।
অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছেন যা খুবই প্রশংসনীয়। ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে চাইল্ড ডেভলপমেন্ট সেন্টার সব সময়ের মত এখনো সপ্তাহের প্রতিদিনই খোলা রয়েছে। শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান প্রফেসর কাজী কামরুজ্জামান স্যারের তত্তাবধানে পরিঢালিত প্রতিষ্ঠানটি রোগীদের বিশেষ করে disable শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক অটিস্টিক বাচ্চা ও তাদের অভিভাবকদের সব ধরনের সহায়তার জন্য ডাক্তার, থেরাপিস্ট এবং সাইকোলজিস্ট সবসময় জন্যই নিয়োজিত আছেন মানসিকভাবে শক্তিশালী বা সাহসিকতা বজায় রাখার জন্য parent counseling দেয়া হচ্ছে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। অভিভাবকরা ফোনের মাধ্যমে আমার সাথে কথা বলছেন।হাসপাতালে সব ধরনের সেবা, সেন্টার থেকে নিতে পারছেন। তারপর ও অভিভাবকদের চিন্তা তাদের এই বিশেষ শিশুটিকে নিয়ে থাকছেই। কিভাবে তাদের সন্তানদের covid-19 এর থেকে রক্ষা করবেন। এর মধ্যে শিশুরা তাদের নিজেদেরকে রক্ষার জন্য WHO (World health organisation) গাইডলাইন ফলো করা শুরু করেছে তাদের অভিভাবক বা সহায়তাকারীর সহায়তায়। তারপরও কিছু নির্দেশনাবলী থাকবে শিশুটির সহায়তাকারীর জন্য। কারণ সহায়তাকারী ভালোভাবে নিরাপদ থাকলেই শিশুটিও নিরাপদ থাকবে।
-যেমন সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে নিয়মিত কমপক্ষে 20 সেকেন্ড ধরে
-সহায়তাকারীর হাত পরিষ্কার করতে হবে অবশ্যই অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে।
-যিনি বিশেয শিশুর সাথে থাকবেন যেমন বাবা-মা বা সাহায্যকারী তাকেও house hold lavel (পারিবারিক ব্যবস্থাপনা) এই বাচ্চাটির সহায়তা শুরুর আগে নিয়মিত হাত ধুয়ে নিতে হবে।
-যদি বাচ্চাটির সহায়তাকারী COVID-19 ভাইরাস উপসর্গ অনুভব করে তবে জরুরি ভিত্তিতে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং হসপিটালে ভর্তি হতে হলে অর্থাৎ যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হবেন তখন অবশ্যই বিশেষ শিশুটির জন্য একজন পরবর্তী নির্ভরযোগ্য সেবাদানকারীর (বাসা বা থেরাপি সেন্টার) থেকে সহায়তা নিতে হবে যাকে সব শিখিয়ে দিতে হবে।
-এবং তাকে শিশুটির যত্নের যাবতীয় তথ্যাবলী অভিভাবকের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে।
-কমপক্ষে 3 ফুট দূরত্ব বজায় রেখে শিশুটির সাথে কাজ করতে হবে মাস্ক পরে।
– বাচ্চাটির সহায়তাকারীকে কিছু সতর্কতা অবশ্যই পালন করতে হবে যেমন কাশি বা হাঁচির সময় অবশ্যই শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ব্যবহারের নিয়ম গুলো তাকে শিখতে হবে যেমন ভাঁজ করা কনুইতে হাঁচি দেওয়া।
– বাচ্চাটিকে সহায়তার জন্য তাকে কাশি বা হাঁচির সময় টিস্যু ব্যবহার শেখাতে হবে এবং ব্যবহারের পর ময়লা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে সাথে সাথে হাত আবার জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
– বাচ্চাটি না পারলে যিনি সহায়তা করবেন তাকেই নিয়ম মেনে চলতে হবে কখনোই তিনি চোখে বা মুখে, হাত জীবাণুমুক্ত না করে স্পর্শ করবেন না।
– সহায়তাকারীর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এ কাজগুলো পালন করবেন।
– অনেক প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিবন্ধী,মানসিক প্রতিবন্ধী,অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গরা বাহিরে কাজ করে , তারা অসুস্থ বোধ করলে যেন বাসায় থাকেন
– ধূমপান করার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করতে সহায়তাকারীকে অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে ধূমপান স্বাস্থ্যের বা ফুসফুসকে দুর্বল করে দেয় যা ভাইরাসের সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
-সহায়তাকারী অবশ্যই অনাবশ্যকীয় ঘোরাফেরা বন্ধ রাখবেন কোন প্রয়োজন ছাড়া তিনি বাইরে বের হবেন না এবং মানুষের সমাগম থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন যেমন মার্কেট অনেক লোক সমাবেশ।
-অনেক বিশেষ শিশু বা অটিজম আক্রান্ত প্রতিবন্ধীদের চলাফেরার জন্য সহায়তাকারী যন্ত্রের (Assistive Device) প্রয়োজন হয় যেমন হুইলচেয়ার(wheelchair), Stick.. এগুলোকে সাবান-পানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
-যদি অটিজম আক্রান্ত প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিবন্ধী শিশু বা অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গ আক্রান্ত হন তবে তিনি যে রুমে নিজেকে আইসোলেশন করে রাখবেন তার মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কার করতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে ।
– গ্লভস ব্যবহার করতে হবে যখন মেঝে, দেয়াল বা ঘরে ঢুকার দরজা স্পর্শ করবেন। এভাবে care giver বা সহায়তাকারীকে নিরাপদ রাখতে পারলে বিশেষ শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক অটিস্টিক শিশুকে খুব সহজে নিজেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
তারপরও যদি শিশুটি আক্রান্ত হয়ে যায় অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। সে ক্ষেত্রে যেসব ডাক্তারগন এসব নিয়ে কাজ করছেন এদেরকেই বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে l তারাই বুঝতে পারবেন চিকিৎসার পাশাপাশি এদের মানসিক প্রশান্তি এবং থেরাপি দেওয়া কিভাবে সম্ভব। এখানে একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম ওয়ার্ক থাকবে।থেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, কাউন্সিলর, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট কাজ করবেন।একটি সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চার আক্রান্ত হওয়া এবং একটি বিশেষ শিশুর আক্রান্ত হওয়া খুব বেশি পার্থক্য করা যাবে না । শুধু একটা বিযয় খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ শিশুটিকে বোঝানো যাবে যে ভাইরাসটা দিয়ে তার আক্রান্ত হয়েছে তার জন্য কি কি নিয়ম কানুন তাদেরকে মেনে চলতে হবে, কিন্তু বিশেষ শিশুটিকে বোঝানোর জন্য আমাদের একটি বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে এবং নিরাপদ রাখার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে।
বিশেষ শিশুটির জীবন নির্ভর করে ডক্টর থেরাপিস্ট এবং স্পেশাল স্কুল এর কার্যক্রমের মাধ্যমে। Covid 19 মহামারীর জন জন্য শিশুটির এসব জায়গায় যাতায়াত অনেকটা বাধাগ্রস্ত হয়, যার জন্য তাদের মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত শিশরা সাধারণত তাদের নিয়মের বাইরে যেতে একটু অপছন্দ করে। তারা ঠিক যেভাবে তাদের ডক্টরস থেরাপিস্টদেরকে ভিজিট করতো ঠিক সেভাবেই আমরা তাদেরকেই ভার্চুয়াল সাপোর্ট দিতে পারি, এতে করে তাদের অস্থিরতা অনেকটাই কমে যাবে।
সাথে সাথে তাদের indoor activities গুলো একটু বাড়িয়ে দিতে হবে যেসব শিশু গান শুনতে পছন্দ করে তাদের জন্য গান, যারা ছবি আঁকতে পছন্দ করে তাদের ছবি আঁকার activities চালু রাখতে হবে।যারা লেখাপড়ায় ভালো তাদের স্কুলের পারফর্মিং এ বিশেয খেয়াল রাখতে হবে, স্কুল টা যেন ভাল ও কার্যকরী হয়, সহজ সাবলীল ও গ্রহণযোগ্যভাবে তাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে তাহলেই তাদের মধ্যে সব অস্থিরতা কমে যাবে।
সর্বোপরি বিশেষ শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক বিশেষ শিশুটিকে সুস্থ রাখার জন্য তাদের খাদ্যাভাসের দিকে একটু বিশেষ নজর দিতে হবে প্রচুর পরিমাণে পানি , তরল খাদ্য, ভিটামিন সি যুক্ত পুষ্টিকর খাবার তাদের খাদ্যতালিকায় রাখা খুবই প্রয়োজন যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
এর জন্য প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতে হবে সহায়তাকারীকে। এভাবেই বিশেষ শিশুটি ভালো থাকবে।
ডাঃ সেলিনা সুলতানা
অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার
চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডিয়েট্রিক বিভাগ
ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল
নতুন সময়/টিআই