ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলামের পরে এ পদে আলোচনায় যারা
ঢাকা: সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে এক আদেশে গতকাল (২৯ অক্টোবর) অবসর প্রদান করার কথা উল্লেখ করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাশ স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছে তার চাকরির বয়স ৫৯ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪৩ (১) (ক) অনুযায়ী তাকে সরকারি চাকরি হতে অবসর প্রদান করা হলো।
আজ শনিবার (৩০ অক্টোবর) ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক আদেশে বলা হয়, সরকারি ভাবে অতিরিক্ত আইজিপি মো. শফিকুল ইসলামকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে আরও এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জানা যায়, সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন, সৎ, যোগ্য, স্বচ্ছতা, ও জবাবদিহিতামূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলায় তাকে এ পদে বহাল রেখেছেন সরকার।
আপাতত তার মেয়াদ বাড়ানো হলেও আগামীতে কে হচ্ছেন ডিএমপি কমিশনার এ নিয়ে চলছে নানান আলোচনা। অতএব এক বছর পর খালি হচ্ছে ডিএমপি কমিশনারের এ পদ। ইতোমধ্যে ডিএমপি কমিশনারের এই পদের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। এই পদের উত্তরসূরি হওয়ার জন্য নিজেদের দায়িত্ব বাড়িয়ে আরো সোচ্চার ভাবে কাজ করছে পুলিশ কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র ও এক উপ-সচিবের দেওয়া তথ্য মতে জানা যায়, শফিকুল ইসলামকে কমিশনার হিসেবে আরও এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও এ সময়ের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিতে যাচাই বাছাই করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপি কমিশনার পদের জন্য মোট পাঁচজনের নাম তালিকায় রয়েছে। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে যে ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার চেয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, ওই তালিকায় এই ৫ জনের নাম রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাবলিক রিলেশন বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘অতিরিক্ত আইজিপির সমমর্যাদা হলো ডিএমপি কমিশনারের পদটি। এটি দেশের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদ। দক্ষ ও যোগ্যরাই এই পদের দায়িত্ব পাবেন। তবে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মহল ও মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভুমিকা রয়েছে।’
বেশকয়েকটি পুলিশের দায়িত্বশীল তথ্য মতে জানা যায়, ডিএমপি কমিশনার হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি যার নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তিনি হলেন- পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি এস. এম রুহুল আমিন। এস. এম রুহুল আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৯০ সালে ১২তম বিসিএস-এ পুলিশ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯১ সালের ২০ জানুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেছেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায়। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার মেজর মরহুম এস.এম আব্দুল খালেকের ছেলে।
তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার, সিলেট জেলার পুলিশ সুপার, ঢাকায় সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি এবং রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে রুহুল আমিন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কমিশনার হিসেবে যোগদান করে বরিশালে পুলিশি সেবার নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এঙ্গোলা, কসোভো, আইভরিকোস্ট ও সাউথ সুদানেও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
এস. এম রুহুল আমিন, অপরাধ দমনের পাশাপাশি তিনি মানবসেবার নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। পুলিশি হয়রানি রোধ এবং বিভিন্ন মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে পুলিশকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নেন। ২০০৩ সালের ৩১ মার্চ তিনি রাজবাড়ী জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ২ বছর দায়িত্ব পালনকালে রাজবাড়ী জেলার সন্ত্রাস দমন এবং মাদক উদ্ধারে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি ঝালকাঠির পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করে সেখানেও অপরাধীদের কাছে আতঙ্কে পরিণত হন।
ডিএমপি কমিশনার হওয়ার পদে দ্বিতীয় যার নাম আলোচনায় রয়েছেন তিনি হলেন- পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন। এম খুরশীদ হোসেন ১২তম বিসিএস থেকে পুলিশে এসেছেন। সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে খুরশীদ হোসেনের বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। একজন সৎ ও দক্ষ অফিসার হিসেবে তারও কমিশনার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলায়।
ডিএমপি কমিশনার হওয়ার পদে তৃতীয় যার নাম আলোচনায় রয়েছে তিনি হলেন- বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির (সারদা, রাজশাহী) প্রিন্সিপাল খন্দকার গোলাম ফারুক। খন্দকার গোলাম ফারুক ১৯৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন।
খন্দকার গোলাম ফারুক, ঠাকুরগাঁও, কিশোরগঞ্জ, ঝালকাঠি, জামালপুর ও ময়মনসিংহে এসপি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্বপালন করেন। ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনায় জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমানের জামাতা আবদুল আউয়ালকে ঠাকুরগাঁও থেকে গ্রেফতার করে ব্যাপক প্রশংসিত হন খন্দকার গোলাম ফারুক। এ কাজের জন্য সরকারের কাছ থেকে পুরস্কারও পান তিনি।
তিনি ১৯৯৯ সালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পান। পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদোন্নতি পান ২০০৩ সালে। তিনি বিসিএস ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
এছাড়া পুলিশ কমিশনার হওয়ার এ পদের প্রতিযোগিতায় তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছেন পুলিশের জুনিয়র দুই কর্মকর্তার নাম। তারা হলেন- পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসপি) প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। তাদের দুজনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। মনিরুল ইসলাম ১৫তম এবং হাবিবুর রহমান ১৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা।
এদিকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও জঙ্গি দমনে মনিরুল ইসলাম অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর জঙ্গিবাদ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেন তিনি। জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে তার অর্জন উল্লেখযোগ্য। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই এ পদে তাকেও দেখা যেতে পারে।
এছাড়া বিসিএস ব্যাচ বিবেচনায় পিছিয়ে থাকলেও সামাজিক ও অপারেশনাল কাজের মাধ্যমে নিজেকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এক্ষেত্রে তার নামও শোনা যাচ্ছে।
তথ্য মতে, ডিএমপি শফিকুল ইসলামের চুক্তি ভিত্তি নিয়োগ শেষ হবার পর ডিএমপি কমিশনার পদে সম্ভাব্য ডিএমপি কমিশনার হিসেবে তালিকায় থাকা প্রথম নামটি হচ্ছে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায়। এম খুরশীদ হোসেনও ১২তম বিসিএস থেকে পুলিশে এসেছেন। সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। তাকে আগামীতে পুলিশ কমিশনার হিসেবে বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, পুলিশ হিসেবে কর্মজীবনের সফলতা, গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বিবেচনায় এ পদটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে অনুমোদন দেন। সিনিয়র-জুনিয়র নির্বিশেষে যে কেউ এ দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে ডিএমপি কমিশনারের পদটিতে কে আসবেন মোটামুটি সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করা হয়।
উল্লেখ্য, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অতিরিক্ত আইজিপি মো. শফিকুল ইসলাম আজ থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অনুযায়ী আরও এক বছর কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করবেন।