নিজেস্ব প্রতিনিধি : করোনারোধে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সারা দেশে মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ কর্মসূচির পঞ্চমদিনে বিভিন্ন কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় ছিল। এদিন দুই লাখ চার হাজার ৫৪০ জন টিকা নিয়েছেন। এ পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। এরইমধ্যে টিকা নিয়েছেন পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৩০৯ জন। আগে যেসব জায়গায় ভিড় কম ছিল, সেখানে এখন আগ্রহী মানুষের উপস্থিতি অনেক বেশি।
তাই ভিড় এড়াতে টিকাদান কেন্দ্রে নিবন্ধনের সুবিধা আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে যারা নিবন্ধন করে কেন্দ্রে যাবেন-এখন থেকে শুধু তাদের টিকা দেওয়া হবে। এদিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২৪৮। গত একদিনে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৪১৮ জন। সব মিলিয়ে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭১।
বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়ার জন্য টিকাদান কেন্দ্রে নিবন্ধনের সুবিধা আপাতত বন্ধ। ভবিষ্যতে প্রয়োজন পড়লে কেন্দ্রে নিবন্ধনের বিষয়টি ফের চালু করা হবে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বেশিসংখ্যক মানুষ কেন্দ্রে নিবন্ধন করে টিকা নিতে যাওয়ায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে।
প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ, বিশেষ করে স্মার্টফোন নেই এমন ব্যক্তিদের জন্য কেন্দ্রে নিবন্ধনের সুযোগ রেখেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, আমরা চাই সুষ্ঠুভাবে টিকাদান কর্মসূচি চলুক। আমরা বিভিন্ন রকমের জায়গা তৈরি করেছি। যারা কেন্দ্রে নিবন্ধন করছেন, তাদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু আগে যারা নিবন্ধন করেছেন তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারছেন না। বয়স্ক লোকজন কেন্দ্রে গিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন।
যারা টিকা দিচ্ছেন-চিকিৎসক ও নার্স তাদেরও কষ্ট হচ্ছে। আমরা এ পরিস্থিতি চলতে দিতে চাই না। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ কার্যক্রম ‘পেপারলেস’ করার ঘোষণা দিতে রাজধানীর ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গতকাল বিভিন্ন হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস (নিন্স) কেন্দ্রে টিকা নিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত হয়ে ফরম পূরণ করে টিকা নেওয়া শুরু করেন।
কয়েকজন নেতা সস্ত্রীক আসেন। অপপ্রচার ও মিথ্যাচারে কান না দিয়ে দেশবাসীকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। অপপ্রচারকারীদের বিষয়ে ডা. রোকেয়া সুলতানা বলেন, অপপ্রচার আগেও ছিল সব কাজে, এখনো আছে। তারপরও মানুষ সঠিক সিদ্ধান্তই নিচ্ছে বলে মনে করি। জাতির পিতা যখন স্বাধীনতা এনেছিলেন, তখনও অপপ্রচার ছিল। কিন্তু সব অপপ্রচার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বাস্তবায়ন করে উনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
করোনায় মৃত্যু আরও ৯, শনাক্ত ৪১৮ : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে গত একদিনে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২৪৮। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৪১৮ জন। সব মিলিয়ে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭১। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ৬৮১ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন।
এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা চার লাখ ৮৫ হাজার ৯৭১। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১৬টি আরটি-পিসিআর ল্যাব, ২৯টি জিন-এক্সপার্ট ল্যাব ও ৬৫টি র্যাপিড অ্যান্টিজেন ল্যাবে ১৫ হাজার ৭৭৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৩৮ লাখ আট হাজার ১৭টি নমুনা। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ২৪৮ এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আট লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯টি।
২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯০ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত একদিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ আর নারী চারজন। তাদের সবাই হাসপাতালে মারা গেছেন। এদের সাতজনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি এবং একজন করে মোট দুজনের বয়স ৫১-৬০ ও ৪১-৫০ বছরের মধ্যে।
মৃতদের মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের, দুজন করে মোট চারজন চট্টগ্রাম এবং খুলনা ও বরিশালের বিভাগের একজন করে বাসিন্দা ছিলেন। টিকা নিলেন আ.লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা : করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়ার পর এ বিষয়ে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতারা। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা।
সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে টিকা নেন আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, শিক্ষা ও মানববিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য আনোয়ার হোসেন, সাহাবুদ্দিন ফরাজী ও সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম।
টিকা নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. রোকেয়া সুলতানা বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক দেশের সঙ্গে লড়াই করে এই টিকা এনেছেন। তিনি মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি কৃষি ও শিক্ষা খাতের মতোই দেখছেন। মহামারির ভয়াল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে সুস্থ রাখার জন্য তিনি টিকার ব্যবস্থা করেছেন।
ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, আজ আমরা একটি সরকারি কেন্দ্রে টিকা নিয়েছি। আমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা টিকা নিতে খুবই আগ্রহী। বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০২০ সালের বাজেট অধিবেশনে জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন-যখনই ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে, প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য তিনি টিকা সুনিশ্চিত করবেন। তিনি তার কথা রেখেছেন। ৭০ লাখ টিকা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পর্যায়ক্রমে ১৩ কোটি মানুষের জন্য টিকার ব্যবস্থা করবেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি অংশ আজ টিকা নিলাম। এছাড়া দলের যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, সরকারের মন্ত্রী আছেন, তারা ইতোমধ্যে টিকা নিয়েছেন। আমরা চাই টিকা নিয়ে যে গুজব আছে, সাধারণ মানুষ যেন সেটাতে কান না দেয়। তারা যেন বিভ্রান্ত না হন।
টিকা নিলেন কৃষক লীগ নেতারা : বৃহস্পতিবার সকালে কৃষক লীগ সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দের নেতৃত্বে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা নেন। এ সময় সমীর চন্দ বলেন, কৃষকসমাজ ও দেশবাসীকে টিকা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করতে আমি কৃষক লীগের নেতাকর্মী এবং আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে টিকা নিয়েছি। টিকা গ্রহণে কোনো সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
আমি সবাইকে টিকা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি। এ সময় ভ্যাকসিন নেন কৃষক লীগের সহ-সভাপতি শেখ মো. জাহাঙ্গীর আলম, রেজাউল করিম হিরণ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ বিশ্বনাথ সরকার বিটু, সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ হাবিবুর রহমান মোল্লা, অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম পানু, দপ্তর সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা, অর্থ সম্পাদক নাজির মিয়া, স্থাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মজিবুর রহমান মিয়াজী, সহ-দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ শওকত হোসেন সানু, সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক জামাল হোসেন মুন্না, সহ-প্রচার সম্পাদক নুরুল ইসলাম বাদশা, সহ-স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক সামিউল বাসির সামি, সদস্য আতিকুর রহমান চৌধুরী, মো. ইকবাল হোসেন, আবুল খায়ের নাঈম, ঢাকা মহানগর উত্তর কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম খান প্রমুখ।
চট্টগ্রামে উপচেপড়া ভিড় : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে করোনার টিকা প্রদানকারী হাসপাতালগুলোতে বৃহস্পতিবার মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে ছিল ভিড়। টিকা নিতে আগ্রহী অনেকে সকাল থেকে দাঁড়িয়েও টিকা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন। আবার কিছু কিছু হাসপাতালে টিকা প্রদানে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতির কারণে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।