শিক্ষা

করোনার প্রভাবে শিক্ষার্থী সংকটে কেজি স্কুল

  • 8:00 am - January 04, 2021

ঢাকা: রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের বাসিন্দা বদরুল ইসলাম তার ছোট ছেলেকে এবার প্লে শ্রেণিতে ভর্তির চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু করোনার কারণে তিনি সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছেন। আগামী বছর সন্তানকে স্কুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই এলাকার অপর বাসিন্দা আবদুর রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে চাকরি করেন। তার কন্যাকে এবার প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ভর্তির ইচ্ছা থাকলেও পিছিয়ে এসেছেন।

বাচ্চা ভর্তি করলেই নানা ধরনের খরচ যুক্ত হবে। বিশেষ করে ক্লাস হোক বা না হোক টিউশন ফি গুনতে হবে। তাই তিনি এ বছর বাচ্চাকে বাসায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিভাবে সারা দেশে হাজার হাজার অভিভাবক সন্তানকে স্কুলে দেয়া থেকে বিরত আছেন। চলমান করোনাই এর মূল কারণ। কেউ সংক্রমণের আতঙ্কে আবার কেউবা ব্যয়ভার বহন থেকে বিরত থাকার লক্ষ্যে।

আর এ ধকল পড়েছে প্রাক-শিক্ষা পরিচালনার মূল প্রতিষ্ঠান কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলের ওপরে। এমনিতে করোনা পরিস্থিতির কারণে অন্তত দুই হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকেছিল সেগুলো আশায় ছিল যে, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে খরা কাটবে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে ভর্তি করাবেন। যারা আছে তারা পুনঃভর্তি হবে। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে আরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

যদিও কোথাও বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন অংশীদার আর পরিচালক নিয়ে চালুর চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। অভিভাবক বদরুল ইসলাম বলেন, সন্তানের বয়স ৪ বছর হয়ে গেছে। তিনি এবারই প্লে শ্রেণিতে স্থানীয় একটি কেজি স্কুলে ভর্তির চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু শুধু করোনা সংক্রমণের কারণে ভর্তি করেননি। তিনি সন্তানের জীবনের কথা আগে ভাবছেন, পরে লেখাপড়া।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ৩৭ লাখ শিশু প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হয়। এ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২ বছর মেয়াদি এ শিক্ষা স্তর চালু করে বয়স আরও ১ বছর কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন ৪ বছর বয়সী শিশুরা পারবে ভর্তি হতে। এরফলে অন্তত ৬০ লাখ শিশু ভর্তি উপযোগী বলে জানা গেছে। এক সময়ে এসব শিশুর প্রায় সবই কেজি স্কুলে ভর্তি হতো।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কেএম এনামুল হক এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, যে কোনো উপযোগিতা নিরূপিত হয় এর প্রয়োজনের ওপর। প্রথমত সরকার প্রাক-প্রাথমিক স্তর খুলে দেয়ায় সেখানে ভর্তির বিকল্প সৃষ্টি হয়েছে। তাই হয়তো অনেকে সন্তানকে ভর্তি করবে। অপরদিকে বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় কেজি স্কুলের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সেখানে অভিভাবকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়নি।

যে কারণে নানা মানের স্কুল গড়ে উঠেছে। করোনাকালে একটা সংকটে তারা পড়েছেন। কিন্তু মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের এক্ষেত্রে অস্তিত্ব সংকটে পড়ার শঙ্কা নেই। এ বিবেচনায় যদি মানহীন স্কুল বন্ধ হয়ে যায় সেটা বরং জাতির জন্য ভালো। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রণোদনা দেবে কিনা সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে আমি মনে করি, কেউ যদি ব্যবসার জন্য এসে থাকেন তাদের দায়ভার সরকার কেন নেবে।

এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জনবলের কর্মস্থলের জন্য যদি বিকল্প প্রয়োজন হয় তাহলে অন্য ব্যবসায় যেতে পারে। বিশেষ করে কারিগরি ও ভোকেশনাল স্তর বিকল্প হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেছে। আর এবার সারা দেশে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের ২ হাজার ৬৩৩ স্কুলে খুলছে। ওই সব প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে শিখন সামগ্রী ও বই দেয়া হচ্ছে।

বিপরীত দিকে, খাতা-কলম, ডায়েরি থেকে শুরু করে সব ধরনের উপকরণ কিনতে হয় কেজি স্কুলগুলো থেকে। তবু অপেক্ষাকৃত ভালো লেখাপড়ার আশায় সন্তানকে এসব স্কুলে ভর্তি করেন অভিভাবকরা। কিন্তু বেশিরভাগ স্কুলই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পরিচালিত হয়। মান নিশ্চিত না করার অভিযোগ অহরহ। জানা গেছে, সারা দেশে অন্তত ৬০ হাজার কেজি স্কুল আছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ১৭ মার্চ অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়।

সেই থেকে বেশিরভাগ স্কুলের সঙ্গে অভিভাবকদের কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান সেই পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টিউশন ফি পায়নি। এমন অবস্থায় কিছু স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। আর বেশিরভাগ স্কুলই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেয়নি। ফলে সারা দেশের এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কোনো রকমে টিকে থাকা স্কুলগুলো নভেম্বর-ডিসেম্বরের আশায় ছিল। কেননা, যারা সন্তানকে ভর্তি করেন তারা এ সময়ে স্কুলে যোগাযোগ করেন। কিন্তু এবার নতুন ও পুরোনো উভয় ধরনের শিক্ষার্থী ভর্তি গড়ে ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের সচ্ছল হওয়ার আশঙ্কা উবে গেছে।

এমন অবস্থায় তারা অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, প্রথমত স্কুল বন্ধ থাকায় ভর্তিতে কেউ আসছেন না। কেননা, ভর্তি হলে তো টিউশন ফি চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত বকেয়া দেয়ার ভয়েও অনেক অভিভাবকরা সন্তানকে নিয়ে আসছেন না। সরকারও হয়তো মনে করছে, তাদের স্কুলগুলো টিকবে না। যে কারণে চাহিদার সব বই দেয়নি। তবে এসব স্কুল বাঁচাতে ১ মাসের জন্য হলেও খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু স্কুল বন্ধ করে দেয়া হলেও ফের চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মাটিকাটা বাজার ইন্সপায়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নাজমুন নাহার রেখা জানান, নিজস্ব ভবনে তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। এরপরও আয়ের অভাবে তাকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে দিতে হয়েছিল। তারা শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের বেতনভাতা দিতে পারেননি।

গ্যাস, পানি বিদ্যুৎসহ যাবতীয় বিলও পরিশোধ করতে পারেননি। যদি প্রতিষ্ঠানের বাড়ি ভাড়া দিতে হতো তাহলে পুনরায় চালুর চিন্তা করতে পারতেন না। তিনি জানান, দেশের ৯৯ শতাংশ কেজি স্কুল ভাড়ার বাসায় পরিচালিত হয়। সেগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। মোহাম্মদপুরের ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাই স্কুল বিক্রির নোটিশ দেয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তকবির আহমেদ জানান, ক্রেতার অভাবে তখন তিনি প্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে পারেননি।

এতদিন লোকসান দিলেও এখন ফের চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষার্থী ভর্তির হার খুবই কমে গেছে। সরকার এখন ২ বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করলেও বহু বছর ধরেই এ শিক্ষা চালু রেখেছে কেজি স্কুলগুলো। অভিভাবকরা সাধারণত বাড়ির কাছাকাছি ভালো কিন্ডারগার্টেনে তাদের সন্তানকে ভর্তি করান। সাড়ে ৩ থেকে ৪ বছর বয়স হলেই প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন।

এরপর নার্সারি ও কেজি শ্রেণিতে পড়ার পর নামি-দামি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিযুদ্ধে নামেন। দেশের সাড়ে ৩শ’ সরকারি হাইস্কুলের মধ্যে খুব কমসংখ্যকেই প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বেশিরভাগ তৃতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী করা হয়। ফলে কেজি স্কুলগুলোতে উপরের শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কম থাকে।

এই শাখার আরও খবর

তিতুমীর কলেজে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িততে শিবিরের ব্যানার দিয়ে ডাকতে গেলেই বাঁধা দেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাঁধে সংঘর্ষ!

>তিতুমীর কলেজে শিবিরের ব্যানার টানাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাঁধা দিলেই হামলা, পরে ছাত্রদের রক্ষায় পাশে দাঁড়াইলে ছাত্রদলের সঙ্গে বাঁধে সংঘর্ষ!  > প্রথমে শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর…

ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচারের দাবিতে তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান

নিজস্ব প্রতিবেদক /কলেজ প্রতিনিধি  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যথাযথ বিচারের দাবিতে “March for Justice কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পূর্ব ঘোষিত এ…

মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের টাঙ্গাইল জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক  রাজধানীর মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের টাঙ্গাইল জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় গতকাল মধ্যরাতে অর্ধশত পরিবারের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার রাত আনুমানিক…

তুহিনের নেতৃত্বে চৌগাছা উপজেলা ছাত্রদলের বর্ণাঢ্য র‍্যালি

নিজস্ব প্রতিবেদক:  আলামিন ইসলাম তুহিনের নেতৃত্বে চৌগাছা উপজেলা ছাত্রদলের বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১ জানুয়ারি) এই বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বর্ণাঢ্য মিছিলে উপস্থিত…

তিতুমীরস্থ পটুয়াখালী জেলা ছাত্র কল্যাণের আহবায়ক ইউসুফ ও সদস্য সচিব আল আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক  সরকারি তিতুমীর কলেজে পড়ুয়া পটুয়াখালী জেলার ছাত্র কল্যাণের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে সরকারি তিতুমীর কলেজে পড়ুয়া পটুয়াখালী জেলার…

যারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা আনসার লীগের সদস্য: সারজিস

ঢাকা: সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর পোশাকধারী আনসার লীগের সদস্যরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। সোমবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায়…

বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর শাহ আলিমুজ্জামানের পদত্যাগের দাবিতে ধর্মঘট

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির (বুটেক্স) ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. শাহ আলিমুজ্জামান (বেলাল) এর পদত্যাগের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বিক্ষোভ ও ধর্মঘট পালন করেছে। শুক্রবার…

শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী

ঢাকা: শিক্ষমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছে। আজ উত্তরা ইউনিভার্সিটির ৮ম সমাবর্তন উপলক্ষে…

স্বত্ব © নতুন সময় - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au